মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংস্কৃতি

ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় বিশ্বে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ দেশের মানুষের আত্মত্যাগ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশের অবদান অনুপ্রেরণা যোগায়।মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগে বাংলাদেশের প্রশংসা বিরল, বাংলাদেশিরা মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। আর এটি কেবল বাংলাদেশ সুনাম অর্জন করেনি সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যারা আন্তর্জাতি মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো।তাছাড়া চলতি ২০১৩ সালের এ বছরটি মাতৃভাষার বছর হিসেবে উদযাপন করা হয়েছে। আর এটি ছিল বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরির যৌথ উদ্যোগ। ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চায় বিশ্বে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ দেশের মানুষের আত্মত্যাগ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষায় বাংলাদেশের অবদান অনুপ্রেরণা যোগায়।মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগে বাংলাদেশের প্রশংসা বিরল, বাংলাদেশিরা মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। আর এটি কেবল বাংলাদেশ সুনাম অর্জন করেনি সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যারা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে ইউনেস্কো।তাছাড়া চলতি ২০১৩ সালের এ বছরটি মাতৃভাষার বছর হিসেবে উদযাপন করা হয়েছে। আর এটি ছিল বাংলাদেশ ও হাঙ্গেরির যৌথ উদ্যোগ।

বাংলা সংস্কৃতি ভাবনা : প্রসঙ্গ পহেলা বৈশাখ

মুঘল বাদশা আকবর-এর শাসনামলে কৃষিকাজ ও কৃষকদের খাজনা প্রদানের সুবিধার্থে ভারতীয় স্যোলার ক্যালিন্ড্যার বা সৈার-পঞ্জিকা ও হিজরি লূনার ক্যালিন্ড্যার বা চান্দ্র-পঞ্জিকার ওপর ভিত্তি করে বাদশা আকবর-এর নির্দেশে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফাতেউল্লাহ শিরাজি বাংলা পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন যেটা বঙ্গাব্দ বা বাংলা অধিবর্ষ হিসাবে পরিচিতি পায়। পহেলা বৈশাখের উদ্যাপন আকবরের আমল থেকেই শুরু হয়। চৈত্রের শেষ দিনে কৃষকরা তাদের সমসত্ম লেনদেন ভূস্বামীদের বুঝিয়ে দিতেন এবং বৈশাখের প্রথম দিনে ভূস্বামীরা কৃষকদের মিষ্টি মুখ করাতেন। এই দিনে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মেলা বসতো। ফলশ্রুতিতে দিনটি বাঙ্গালীদের পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হল। এই দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল হালখাতা বা হিসাবের নতুন খাতা প্রস্ত্ততকরণ। যা অদ্যবদি এদেশের ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত আছে।
কলকাতাতে বৈশাখ মাসকে বিবাহের জন্য আদর্শ সময় মনে করা হত। মানুষজন নতুন পোশাক পরিধান করে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যেত। চৈত্র মাস জুড়ে মানুষ নানাবিধ কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদেরকে উদ্যাপনের প্রস্ত্তত করে গড়ে তুলত। এ সময় পোশাক ব্যবসায়ীরা বেশ ছাড়ে পোষাক বিক্রি করতো। আর বৈশাখ মাস জুড়ে চলত বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড। পরিবারের সদস্যদের মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনা করা হত। মেয়েরা লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরে আর ছেলেরা কুর্তা আর ধুতি পরে সকালে নতুন বর্ষ বরনে শোভাযাত্রা বের করতো।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আমাদের সংস্কৃতির অতি প্রাচীন অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম হল পহেলা বৈশাখ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমসত্ম বাঙ্গালীদের অতি প্রাণের উৎসব এই পহেলা বৈশাখ। তৎকালীন পাক-শাষনামলে পূর্ব বাংলাকে মুসলমানদের ভূখন্ড বিবেচনা করে এবং পহেলা বৈশাখকে প্রকৃতি-পূজা বা হিন্দুদের আচার হিসাবে প্রচার করে পাক-সরকার কৌশলে বাঙ্গালীদের সংস্কৃতহীন করার যে হীন মতলব আটে তাতে অনেক বাঙ্গালী মুসলমান বিভ্রামেত্ম পড়ে যায় এবং যার একটা রেশ এখনো গোঁড়া মুসলমান বাঙ্গালীদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীতে ’৫২-তে সংগ্রাম করে ভাষা অর্জনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙ্গালীরা তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন করে সচেতন হতে শুরু করে। ’৭১-এ একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডের পাশাপাশি আমরা পাই আমাদের সংস্কৃতির স্বাধীনতা। বলা যায় দীর্ঘ দিন যুদ্ধ করে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতা পাই বলেই আমরা আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে খুব সজাগ হয়ে উঠি। ফলত পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে হিন্দু-মুসলমান সকলের প্রাণের উৎসব। এবং বাঙ্গালীর জাতীয় ও সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান তো বটেই। সমগ্র বৈশাখ মাস হয়ে ওঠে বাঙালীর আপন সংস্কৃতির সাধনা ও প্রেরণার মাস।

পহেলা বৈশাখের সাথে আমাদের অনেক পুরানো সংস্কৃতি জড়িয়ে ছিল, যেমন–যাত্রা, পালা গান, কবি গান, গাজির গান, অলকাপ গান, পুতুল নাচ, বাউল-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি গান, বর্ণনামূলক নাটক, যেমন–লাইলি-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ, ইউসুফ-জুলেখার মঞ্চস্থ, ইত্যাদি যা এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। যদিও পুতুল নাচ ও যাত্রা এখনো কোথাও কোথাও দেখানো হয় তবে তা বিকৃত অবস্থায়। একসময় ঢাকায় ঘুড়ি উড্ডয়ন, মুন্সিগঞ্জে ষাঁড়ের দৌড় প্রতিযোগিতা, এবং গ্রামাঞ্চলে ঘোড়-দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের যুদ্ধ, নৌকা বাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল যা এখন প্রায় আমাদের বিলুপ্তপ্রায় সংস্কৃতি হিসাবে গণ্য হচ্ছে। তবে এখনো পহেলা বৈশাখে চট্টগ্রামে বলি ও রাজশাহীতে গম্ভীরা বেশ আড়ম্বরের সাথে পালন করা হয়।

পহেলা বৈশাখ কি শুধুই একটি অনুষ্ঠান? অনুষ্ঠানতো আরো আছে, যেমন–ঈদ, জন্মদিন, বিবাহ, ভালোবাসা দিবস, বাবা দিবস, হ্যাপি নিউ ইয়ার আরো শত শত। এই অনুষ্ঠানগুলোর সাথে পহেলা বৈশাখের পার্থক্যটা কোথায়–এই বিষয়গুলো একটু ভেবে দেখা দরকার।

গ্রাম্য সংস্কৃতির বা কৃষকদের এটাই একমাত্র অনুষ্ঠান যেটা ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পালন করা হয়। এই অনুষ্ঠানের মর্মমূল হচ্ছে কৃষকদের নতুন ফসল ঘরে তোলা ও জমিদারদের কাছে ঋণমুক্ত হওয়ার আনন্দ। অথচ শহরের কয়জনই বা এই বিষয়ে অবগত থাকেন! জমিদারী প্রথা বিলোপের সাথে সাথে নগরে অর্থাৎ কৃষকদের মাঝে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করার আমেজ বেশ থিতিয়ে এসেছে। তবে বাংলা দিনপঞ্জিকার প্রথম দিন হিসাবে দেশের শিক্ষিত সমাজে এর কদর বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে।

বিষয়টি আপাত দৃষ্টিতে আমাদের ভেতরে আশার সঞ্চার করে বটে; কিন্তু একটু তলিয়ে এবং খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে আজকাল সবখানেই আমাদের সংস্কৃতি চর্চার নামে যা হচ্ছে সেটা হল তার বিকৃতিকরণ–ভাষা থেকে শুরু করে পোশাক, সঙ্গীত, নৃত্যকলা, খাদ্যাভ্যাস সবখানেই। আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি এখন ব্যবসায়ের পণ্যতে পরিণত হয়েছে। আমাদের লোকজ সংস্কৃতিকে বিশেষ বিশেষ দিনে বিশেষ বিশেষ কায়দায় প্রদর্শন করে সর্বচ্চ মুনাফা আদায় করছে বহুমুখী ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো; টেলিভিশন ও প্রিন্টেড মিডিয়া রঙিন রঙিন ছবি পেশ করে কাটতি বাড়াচ্ছে বহুগুণে, ১০টি এস এম এস ফ্রি দেওয়া হচ্ছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য–এমনই সসত্মা আবেগ আমাদের! আমি এসবের কোনকিছুকেই দোষের মনে করছি না। কিন্তু যখন ‘অতিরিক্ত’ ছাপিয়ে ওঠে ‘প্রকৃত’ আয়োজনকে তখন মাথা ব্যথা করে বৈকি।

রমনার বটমূলে (১৯৬৫ সাল থেকে) রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ এসো হে..’ গানের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার বাঙ্গালী পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেই। এখানে প্রকাশ পায় বাংলার স্বাধীন মানুষের প্রাণের উচ্ছ্বাস-এর বহিঃপ্রকাশ। সমসত্ম জাতি একই কাতারে সামিল হয়ে আনন্দ উদ্যাপন করে এমন দিন হরহামেশা আশে না। অমত্মত আমাদের মত দরিদ্র-দুর্নিতিগ্রসত্ম দেশে তো সেটা কল্পনা করাই আকাশ কুসুম চিমত্মার সামিল। হাজার সমস্যায় জর্জরিত আমাদের জীবন প্রবাহ, সমাজ ও রাষ্টীয় ব্যবস্থা। এমন অবস্থায় পহেলা বৈশাখ প্রতি বছর সমগ্র বাঙ্গালীর দেহে এক চিলতে প্রাণের সঞ্চার করে। এবং সেটা রমনার বটমূলে বেশ স্পষ্টত হয়। তবে এখানে যা হয় তার সবটা আমাদের সংস্কৃতি না। ২০০১ সালে বোমা হামলা, প্রতি বছরই যত্রতত্র নারীদের টিজিং এর স্বীকার হওয়া। আর ১০০-২০০ টাকা দরে এক প্লেট পামত্মা-ইলিশ খাওয়া। চাইনিজ বা থাই না খেলে যে বাঙ্গালীদের আজকাল জাত রক্ষা হয় না, সে বাঙ্গালীদের বছরে এই একটি দিনে আয়েশ করে পামত্মা-ঈলিশ ভক্ষণ করে বাঙ্গালীত্ব যাহির করার যে প্রয়াস তা আমাদের পূর্বপুরুষদের দরিদ্রতাকে প্রচন্ডভাবে অপমান করে এবং হেয় করে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যত দিন যাচ্ছে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন তত বেশি আড়ম্বরময় হচ্ছে। তার মানে কি এই যে সময়ের পরিক্রমায় আমাদের বাঙ্গালীত্ব্ আরো প্রগাঢ় ও গূঢ় হচ্ছে?–বোধহয় না। মিথ্যাকে যাহির করার জন্যই তো ঢাক-ঢোলের প্রয়োজন বেশি! আমরা যে আমাদের হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় অর্জিত সংস্কৃতি থেকে ক্রমান্বয়ে ছিটকে যাচ্ছি সেটা ঢেকে রাখার জন্যই এত বাদ্য পেটানো। নিজের বিবেককে ঠেকানো ও ঠকানোর সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম এটা।
অতি আড়ম্বরের সাথে নেচে-গেয়ে পহেলা বৈশাখ পালন এখনকার প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় ফ্যাশন ও প্যাশন হয়ে উঠেছে। আর পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে কোনও ফ্যাশনই সময়কে জয় করতে পারে নি। তাই আমাদের সংস্কৃতির আচার ও অনুষ্ঠানগুলো যেদিন থেকে ফ্যাশন-এর কারণ হয়ে উঠেছে সেদিন থেকে শুরু হয়েছে আমাদের সংস্কৃতির সর্বনাশ। একটা জাতি যখন তাদের সংস্কৃতি ও লোকাচারকে বাইরে বের করে আনে তখন তাদের শূন্য অন্দরমহলে অন্যকোনও সংস্কৃতি গোপনে দানা বাঁধতে থাকে। আমাদের ভেতরে এমনটি হচ্ছে না তো ? একটু বুকের ভেতরটা নেড়ে-ঘেঁটে দেখা খুব জরুরী হয়ে উঠেছে। স্বদেশ ও সংস্কৃতিকে আপন অমত্মরে লালন করতে হবে। তাই বলে কি অনুষ্ঠান, আমেজ-আনন্দ করা যাবে না? অবশ্যই যাবে। বাড়িতে নতুন অতিথির আগমনে আমরা আনন্দ-অনুষ্ঠান করি না–ব্যপারটা হতে হবে ঐরকম, ভেতর থেকে উৎসারিত।